লিভার ক্যান্সার যেটাকে আমরা যকৃতের ক্যান্সার বলি, এটা একটি মারাত্মক রোগ। যকৃতের কোষগুলো অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে এবং টিউমার তৈরি করে। লিভার ক্যান্সারকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়: প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক। প্রাথমিক লিভার ক্যান্সার সরাসরি লিভার থেকেই শুরু হয়, আর মাধ্যমিক লিভার ক্যান্সার অন্য কোনো অঙ্গ থেকে লিভারে ছড়ায়।
কেন হয় লিভার ক্যান্সার?
লিভার ক্যান্সারের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে কিছু বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এগুলো হলো:
হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাস সংক্রমণ:
হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাস লিভারে দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা পরবর্তীতে লিভার ক্যান্সারের কারণ হতে পারে।
অতিরিক্ত মদ্যপান:
অতিরিক্ত মদ্যপান লিভারে স্থায়ী ক্ষতি করে এবং সিরোসিস (লিভারের শক্ত হওয়া) সৃষ্টি করে, যা লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
ফ্যাটি লিভার ডিজিজ:
লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমা হলে ফ্যাটি লিভার ডিজিজ হতে পারে। এটি লিভারের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং ক্যান্সারের সম্ভাবনা বাড়ায়।
আনহেলদি ডায়েট:
ফাস্ট ফুড, অতিরিক্ত চর্বি এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার লিভারের জন্য ক্ষতিকারক। এটি দীর্ঘমেয়াদে লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
জেনেটিক ফ্যাক্টর:
কিছু জেনেটিক কারণেও লিভার ক্যান্সার হতে পারে। পরিবারে পূর্বের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বেশি থাকে।
লক্ষণগুলো কি কি?
লিভার ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণগুলো সহজে বোঝা যায় না। তবে কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো:
পেটের উপরের দিকে ব্যথা:
লিভারের স্ফীতি বা টিউমার পেটের উপরের দিকে ব্যথার কারণ হতে পারে।
অবসাদ এবং দুর্বলতা:
লিভার ঠিকমতো কাজ না করলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সবসময় ক্লান্তি অনুভব হয়।
ওজন হ্রাস:
আকস্মিক শরীরের ওজন হ্রাস, বিশেষ করে যখন কোন কারণ ছাড়াই আপনি খেয়াল করবেন শরীরের ওজন হ্রাস পাচ্ছে।
বমি ভাব এবং বমি:
লিভার ক্যান্সার লিভারের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যা বমি ভাব এবং বমির কারণ হতে পারে।
জন্ডিস:
লিভার ক্যান্সারের ফলে ত্বক এবং চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যেতে পারে, যাকে আমরা জন্ডিস বলি।
পেটে ফোলা:
লিভারে টিউমার বা তরল জমে পেট ফুলে যেতে পারে।
মল বা প্রস্রাবে রক্ত:
মলে বা প্রস্রাবে রক্ত দেখা যেতে পারে, যা লিভার ক্যান্সারের একটি লক্ষণ।
কোন বয়সে লিভার ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি
লিভার ক্যান্সার যে কোনো বয়সেই হতে পারে, তবে কিছু বয়সে এর ঝুঁকি বেশি থাকে। বয়সভেদে লিভার ক্যান্সারের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিভিন্ন বয়সের মানুষেরা বিভিন্ন কারণ এবং ঝুঁকির কারণে এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। এখানে বয়সভেদে লিভার ক্যান্সারের সম্ভাবনা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
শিশু এবং কিশোর বয়স (০-১৮ বছর)
এই বয়সের শিশুদের মধ্যে লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি কম, তবে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের ক্যান্সার, যেমন হেপাটোব্লাস্টোমা, শিশুদের মধ্যে হতে পারে। হেপাটোব্লাস্টোমা মূলত নবজাতক এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
তরুণ বয়স (১৯-৩৫ বছর)
তরুণ বয়সে লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। তবে যদি এই বয়সের কেউ হেপাটাইটিস বি বা সি ভাইরাসে সংক্রমিত হয়, তাহলে লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এসময় স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
যুবক বয়স (৩৬-৫০ বছর)
যুবক বয়সে লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি কিছুটা বেশি। এসময় অনেকের মধ্যে অতিরিক্ত মদ্যপান, ফ্যাটি লিভার ডিজিজ, এবং হেপাটাইটিস সংক্রমণের কারণে লিভার ক্যান্সার হতে পারে। মধ্য বয়সে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এই ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
প্রৌঢ় বয়স (৫১-৬৫ বছর)
এই বয়সে লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। কারণ এসময় অনেকের লিভারে দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ, সিরোসিস, এবং অন্যান্য জটিলতা দেখা যায়। হেপাটাইটিস বি এবং সি সংক্রমণের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এই বয়সে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বৃদ্ধ বয়স (৬৫ বছরের উপরে)
বৃদ্ধ বয়সে লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এসময় লিভারের কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়। লিভারের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি এবং পূর্বের সংক্রমণগুলো এই বয়সে ক্যান্সারের কারণ হতে পারে।
লিভার ক্যান্সার প্রতিরোধের উপায় গুলো কি কি?
লিভার ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব যদি আমরা কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস এবং সচেতনতা মেনে চলি। পুষ্টিবিদের দৃষ্টিকোণ থেকে, লিভার ক্যান্সার প্রতিরোধের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় এখানে আলোচনা করা হলো।
১. পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ
লিভারের সুস্থতার জন্য সঠিক পুষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুষ্টিকর খাদ্য লিভারকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।
- ফলমূল ও সবজি: প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে ফলমূল এবং সবজি খাওয়া উচিত। এগুলোতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা লিভারকে ক্ষতিকারক ফ্রি র্যাডিকেল থেকে রক্ষা করে।
- প্রোটিন: স্বাস্থ্যকর প্রোটিন যেমন মুরগির মাংস, মাছ, ডাল, এবং বাদাম খাওয়া উচিত। প্রোটিন লিভারের কোষ পুনর্গঠনে সাহায্য করে।
- শস্যদানা: শস্যদানা, যেমন ব্রাউন রাইস এবং ওটমিল, লিভারের জন্য ভালো। এটি লিভারের কার্যক্ষমতা উন্নত করে।
২. হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ
হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাস লিভারের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এগুলোর সংক্রমণ প্রতিরোধ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
- টিকাদান: হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের টিকা নেওয়া উচিত। এটি সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর।
- নিরাপদ রক্ত সরবরাহ: রক্ত গ্রহণের সময় নিশ্চিত করতে হবে যে রক্ত নিরাপদ এবং পরীক্ষা করা হয়েছে।
- নিরাপদ যৌন আচরণ: যৌন সম্পর্কের সময় সুরক্ষা ব্যবহার করা উচিত। এটি হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাস সংক্রমণ থেকে রক্ষা করবে।
৩. মদ্যপান সীমিত করা
অতিরিক্ত মদ্যপান লিভারের ক্ষতি করে এবং লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
- মদ্যপান কমানো: অতিরিক্ত মদ্যপান থেকে বিরত থাকা উচিত। সপ্তাহে দুই দিনের বেশি মদ্যপান না করা ভালো।
- মদ্যপান বন্ধ করা: যারা অতিরিক্ত মদ্যপান করেন, তাদের মদ্যপান পুরোপুরি বন্ধ করা উচিত।
৪. ওজন নিয়ন্ত্রণ
অতিরিক্ত ওজন এবং স্থূলতা লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
- স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা উচিত।
- নিয়মিত ব্যায়াম: নিয়মিত ব্যায়াম ওজন কমাতে এবং লিভারকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট ব্যায়াম করা উচিত।
৫. প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়ানো
প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার লিভারের জন্য ক্ষতিকারক।
- প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়ানো: ফাস্ট ফুড, প্যাকেটজাত খাবার এবং উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া কমাতে হবে।
- স্বাস্থ্যকর খাবার: তাজা খাবার এবং বাড়িতে রান্না করা স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া উচিত।
৬. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা লিভারের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে সাহায্য করে এবং ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণগুলি নির্ণয় করতে সাহায্য করে।
- নিয়মিত চেক-আপ: লিভারের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
- রক্ত পরীক্ষা: রক্তের পরীক্ষার মাধ্যমে লিভারের কার্যক্ষমতা যাচাই করা উচিত।
বয়সভেদে লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, তবে যেকোনো বয়সেই সচেতনতা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন লিভার ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সঠিক পুষ্টি গ্রহণ এবং হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাস সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত ব্যায়াম লিভারের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিজের এবং পরিবারের সুস্থতার জন্য সবসময় সচেতন থাকুন এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুলুন।